ম্যাথস্কোপ

বইটা হাতে নিয়ে সবার আগে প্রচ্ছদে লেখা কথাগুলো পড়েই যে কেউ বিভ্রান্ত হয়ে যাবেন। বলছি অভিক রায়ের লেখা ম্যাথোস্কোপ বইটির কথা। গণিত নিয়ে লেখা এই বইটির একটা বড় অংশজুড়ে লেখক নানারকম বিভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। গণিতের ইতিহাসে ভ্রান্তি আর বিভ্রান্তি কেমন করে গণিতবিদ, যুক্তিবিদদের ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে তা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। লেখকের ভাষায়, “‘ডিম আগে না মুরগি আগে?’ এরকম বহু প্রকার প্রশ্ন যুগ যুগ ধরেই বহু জ্ঞানী দার্শনিকদের বিরক্ত, বিব্রত এবং (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই) অভিভূত করেছে। বিভ্রান্তির মজা এখানেই যে বিভ্রান্তি হচ্ছে যাদুর মতো। তবে জাদুকর আর গণিতবিদের মাঝে বড় একটা পার্থক্য আছে। জাদুকর তার জাদুর রহস্য যতটা পারেন লুকিয়ে রাখেন (নইলে দিনে দশটা করে পি. সি. সরকার জন্মাত) আর গণিতবিদ চেষ্টা করেন বিভ্রান্তি তথা paradox–এর যাদুর রহস্য উন্মোচন করার।”

মোট ৮টি বিষয় নিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। গণিতের জগতে বিভ্রান্তির রকমফের এর সাথে সাথে ভিঞ্চির ভিট্রুভিয়ান মানব, অসীম সেটের ধারণা, কাটাকাটি খেলার গণিতের মতো মজার এবং একই সাথে কৌতূহল-উদ্দিপক বিষয় উঠে এসেছে বইটিতে।  মাঝে মাঝেই দেখা যায় অনেকে ১=২, ১=-১ প্রমাণ করে দেখান। এইসব প্রমাণগুলোর সমস্যাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন লেখক। তাছাড়া paradox of Berry, horse paradox, Thompson’s lamp, Benardete’s paradox, Grelling-Nelson paradox, Russell’s paradox এর মতো জগৎবিখ্যাত সব বিভ্রান্তি উঠে এসেছে বইটিতে। গণিত, শিল্প, দর্শন জ্ঞানের এই তিনটি শাখা একত্র হলে কী অসাধারণ সব কর্ম সৃষ্টি হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ভিট্রুভিয়ান মানব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সেটাই বার বার উঠে এসেছে।

লেখক এই বইটিতে অসীমের ধারণা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন। অসীম আসলে কী এবং ১ কে ০ দিয়ে ভাগ করলে কেন অসীম হয় না তা খুব প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশি হিসেবে আমরা সবাই কম বেশি ক্রিকেটপ্রেমী। কিন্তু ডাকওয়ার্থ লুইস মেথড (D/L method) সম্পর্কে আমরা অনেকেই খুব বেশি কিছু জানি না। এই বইটির একটি বড় আকর্ষণ হচ্ছে ডাকওয়ার্থ লুইস মেথড (D/L method) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। বৃষ্টির কারণে ম্যাচ বিঘ্নিত হলে D/L method কাজে লাগিয়ে কীভাবে ওভার আর টার্গেট কমিয়ে দেয়া হয় অথবা ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করা হয় তার বিস্তারিত পাওয়া যাবে এই বইটিতে।

কাটাকাটি খেলার মধ্যে লুকিয়ে থাকা গণিতের সন্ধান পাওয়া যাবে “কাটাকাটি খেলার গণিত” অধ্যায়টিতে। আর একেবারে শেষের অধ্যায়টিতে প্যাস্কেলের ত্রিভুজ, ফিবনাচ্চি সংখ্যা, Cauchy Scwartz অসমতা, Farmat’s Little Theorem, অয়লারের অভেদ, e কেন অমূলদ সংখ্যা এমন বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

বইটি অনুপম প্রকাশনী থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। বিষয় বৈচিত্রের জন্য গণিতের অন্যান্য বই থেকে এই বইটিকে একটু আলাদাই বলতে হবে। বইটি সম্পর্কে লেখকের নিজের অভিমত, “এই বইটি অন্য একটি বইয়ের চেয়ে আলাদা, এর কারণ অবশ্য এটি অন্য যেকোনো বইয়ের চেয়ে ভালো এমন কিছু নয়। এই বইটিতে কাউকে গণিত সম্পর্কে শেখানোর কোনো প্রয়াস করা হয়নি…………বিষয়গুলো একদমই ‘সিলেবাসের বাইরে’ এবং সচরাচর কোনো বইয়ে এই বিষয়গুলোকে ব্যাপ্ত পরিসরে উঠে আসতে দেখিনি।”

এতসব বিচিত্র তথ্য আর প্রাঞ্জল রচনাশৈলী গণিতপ্রেমী পাঠককে টেনে ধরে রাখবে বইয়ের পাতায়।