মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় নক্ষত্র

নাম ট্যাবির নক্ষত্র, এরকম রহস্যময় কোনো নক্ষত্রের সাথে জ্যোতির্বিদদের আগে কোনোরকম পরিচয় ছিল না। নক্ষত্রটি সময় সময় অস্বাভাবিক হারে উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। এর পেছনে কেউ দায়ী করছেন বড় কোনো গ্রহকে, কেউ বলছেন এক ঝাঁক ধূমকেতুর কথা। কেউ আবার এক ধাপ সামনে গিয়ে দোষ চাপাচ্ছেন এলিয়েনদের হাতে। সত্যিকারের ঘটনা এখনো এক রহস্য। ইদানিং নিয়মিত খবর হচ্ছে নক্ষত্রটি নিয়ে।

এর পেছনে আঠার মতো লেগে থাকা এবং বহুলভাবে প্রচার ও পর্যবেক্ষণ শুরু করতে ভূমিকায় রাখায় জ্যোতির্বিদ তাবেথা বয়াজিয়ানের নাম অনুসারে একে ট্যাবির নক্ষত্র (Tabby’s Star) বলে ডাকা হচ্ছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি নক্ষত্রটির অদ্ভুত আচরণ নিয়ে কথা বলেন টেড টক-এ। অপূর্ব সেই লেকচারে তিনি কী বলেছিলেন তার সারসংক্ষেপ জেনে নিলেই অনেক কিছু জানা হয়ে যাবে। চলুন, শুনে আসি।

“অসাধারণ দাবীর পক্ষে অসাধারণ প্রমাণ থাকতে হয়। একজন জ্যোতির্বিদ হিসেবে সর্বশেষ উপায় হিসেবে এলিয়েন তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়া আমার কাজ ও দায়িত্ব। এখন আমি এ সম্পর্কে একটি ঘটনা বলতে চাই। গল্পটির বিষবস্তু হলো নাসার অভিযান, কিছু সাধারণ মানুষ এবং আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে রহস্যময় নক্ষত্র।

২০০৯ সালে নাসার কেপলার মিশনের মাধ্যমে ঘটনার শুরু। কেপলারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সৌরজগতের বাইরে গ্রহের খোঁজ করা। মহাকাশের একটি বিশেষ দিকে নজর রেখে এটি তা করতে থাকে। এ বিশেষ দিকটিতে এটি এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার নক্ষত্রের উপর অবিরত নজর রাখে। প্রতি ৩০ মিনিটে সংগ্রহ করতে থাকে তথ্য। এটি খোঁজ করছিল অতিক্রমণ (Transit) নামক ঘটনাটির। আমাদের চোখের সামনে একটি গ্রহ যখন একটি নক্ষত্রের উপর দিয়ে অতিক্রম করে চলে যায়, তখন তাকে আমরা বলি গ্রহটির অতিক্রমণ। এটি ঘটার সময় নক্ষত্রের সামান্য পরিমাণ আলো বাধাপ্রাপ্ত হয়।1চিত্রঃ গ্রহদের অতিক্রমণের সময়ের প্রতিক্রিয়া।

নাসা কেপলারের সবগুলো উপাত্ত থেকে অতিক্রমণ খুঁজে বের করার জন্যে আধুনিক কম্পিউটার তৈরি করে। প্রথমবার উপাত্ত প্রকাশ করা হলে ইয়েল ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিদদের মাথায় একটি মজার চিন্তা ঘুরপাক খায়। কেমন হবে যদি কম্পিউটার কিছু জিনিস মিস করে ফেলে?

ফলে আমরা একটি দলগত প্রকল্প হাতে নিলাম। ‘প্ল্যানেট হান্টারস’ নামের এ প্রজেক্টের সবাই মেতে উঠলেন উপাত্ত নিয়ে। নকশা খুঁজে বের করার ব্যাপারে মানব মস্তিষ্কের ক্ষমতা অসাধারণ। অনেক সময় এই ক্ষমতার কাছে হার মানে কম্পিউটারও। কিন্তু এই প্রকল্পটি চারদিক থেকে সন্দেহের শিকার হয়। আমার সহকর্মী ও প্ল্যানেট হান্টারস প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ডেবরা ফিশার বলেন, ঐ সময় লোকেরা বলছিলো, “আপনারা উন্মাদ। কম্পিউটার কোনো সংকেত মিস করবে, এটা একেবারে অসম্ভব।” ফলে মানুষের সাথে যন্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।

একটি গ্রহ পেয়ে গেলেও তা হবে দারুণ ব্যাপার। চার বছর আগে আমি যখন এ দলে যোগ দেই, ততদিনে একের বেশি পাওয়া হয়ে গেছে। আর আজকে তিন লাখ বিজ্ঞানপ্রেমীর সহায়তায় আমরা ডজন ডজন গ্রহ খুঁজে পেয়েছি। এরই একটি হলো আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে রহস্যময় নক্ষত্রের।

একটি গ্রহ যখন কোনো নক্ষত্রকে অতিক্রমণ করে, তখন নক্ষত্রের কিছু আলো বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ অতিক্রমণের দৈর্ঘ্য থেকে বস্তুটির আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বৃহস্পতির কথাই ধরুন, গ্রহরা বৃহস্পতির চেয়ে খুব একটা বড় হয় না। বৃহস্পতি কোনো নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা এক শতাংশ কমাতে পারবে। অন্য দিকে পৃথিবী বৃহস্পতির চেয়ে এগারো গুণ ছোট। এত ছোট সংকেত উপাত্তের মধ্যে চোখে পড়ে না বললেই চলে।

আমাদের রহস্যের কাছে ফিরে আসি। কয়েক বছর ধরে উপাত্তের ভেতর গ্রহ শিকারীরা অতিক্রমণের খোঁজ করছিলেন। তারা একটি নক্ষত্র থেকে রহস্যময় সঙ্কেত দেখতে পেলেন। নক্ষত্রটির নাম কেআইসি ৮৪৬২৮৫২। ২০০৯ সালের মে মাসে তারা একে প্রথম দেখেন। বিভিন্ন ফোরামে শুরু হয় আলাপ আলোচনা।

তারা বললেন, বৃহস্পতির মতো কোনো বস্তু নক্ষত্রের আলোতে এমন বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। তারা আরো বললেন, বস্তুটি অবশ্যই বিশাল হবে। সাধারণত একটি অতিক্রমণ কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। কিন্তু এটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকল।

তারা আরো বললেন, গ্রহদের অতিক্রমণের সময় যেমন দেখা যায় তার সাথে এর মিল নেই। এটা দেখে মনে হলো যে নক্ষত্রের আলো যে জিনিসে বাধা পাচ্ছে সেটি গ্রহদের মতো গোল নয়। এরপর আরো ক’বার এটি ঘটলো। এরপর চুপচাপ থাকলো কয়েক বছর।

এরপর ২০১১ সালের মার্চে আবার আমরা এটি দেখলাম। এবার নক্ষত্রের আলো একেবারে ১৫ শতাংশ ঢাকা পড়ে গেলো। গ্রহদের তুলনায় এ পরিমাণ কিন্তু অনেক বেশি, গ্রহগুলো তো মাত্র এক শতাংশ ঢেকে রাখতে পারে। এছাড়াও ঘটনাটি অপ্রতিসম। এক সপ্তাহ ধরে ক্রমাগত আলো-আঁধারির খেলা দেখিয়ে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।

এরপর ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটলো না। এরপর আবার ঘটতে থাকলে অদ্ভুত সব কাণ্ড। নক্ষত্রের আলো বাঁধা পড়তে লাগলো। এটি এবার স্থায়ী হলো প্রায় একশ দিন। ততদিনে কেপলার মিশনের সমাপ্তির দিন এসে গেছে। এবারের আলোর বাঁধাগুলো বিভিন্ন রূপ নিল। কোনোটা খুব তীক্ষ্ণ, কোনোটা আবার বেশ চওড়া। এদের স্থায়ীত্বও আলাদা আলাদা। কোনোটি এক বা দুই দিন টিকে থাকলো, কোনোটি টিকে থাকলো এক সপ্তাহেরও বেশি। সব মিলিয়ে এবারে নক্ষত্রের আলোর বাঁধার পরিমাণ দাঁড়ালো ২০ শতাংশের বেশি। এর অর্থ হলো- নক্ষত্রটির আলোকে যে-ই ঢেকে রাখছে, তার ক্ষেত্রফল আমাদের পৃথিবীর চেয়ে ১,০০০ গুণ বড় হবে।

এটি বেশ বড় একটি ঘটনা। অনুসন্ধানী দল এটি বিজ্ঞানীদের দেখালে তারা এতে উৎসাহী হলেন না। বিজ্ঞানীরা প্রথমে এটি দেখে ভাবলেন, “এ আর এমন কী? নিশ্চয় উপাত্তে কোনো গণ্ডগোল আছে।” কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে দেখার পরেও উপাত্তে ভুল পাওয়া গেলো না। ফলে মেনে নিতে হলো সত্যিই মহাকাশের কোনো কিছু নক্ষত্রের আলোকে ছড়াতে দিচ্ছে না। ফলে এ অবস্থায় নক্ষত্রটি সম্পর্কে আমরা সাধ্যমতো জানার চেষ্টা করলাম যেন কোনো সমাধান পাওয়া যায় কিনা তা দেখা যায়। অনুসন্ধানী দলও লেগে রইলো একই কাজে।

কেউ বললেন, এমন তো হতে পারে যে নক্ষত্রটি খুব নতুন এবং এটি যে ঘূর্ণায়মান মেঘ থেকে সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো এর চারপাশে বিদ্যমান আছে। অন্য কেউ বললো, নক্ষত্রটি থেকে ইতোমধ্যেই গ্রহের জন্ম হয়েছে এবং এরকম দুটি গ্রহের সংঘর্ষ হয়েছে, যেমনভাবে পৃথিবী ও চাঁদ সৃষ্টির সময় সংঘর্ষ হয়েছিল। এ দুটি তত্ত্বই উপাত্তের কিছু অংশের ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো- নক্ষত্রটি যে নতুন এমন কোনো লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে না। নক্ষত্রটি নতুন হলে এর আলোর উত্তাপ পাওয়া যেকোনো বস্তু জ্বলে উঠতো। আর যদি গ্রহদের সংঘর্ষ হতো, তবে অনেক ধূলিকণা দেখা যেতো।

এর ফলে আরেকজন বললেন, হতে পারে যে অনেকগুলো ধূমকেতুর সমাবেশ খুব বেশি

বাঁকা কক্ষপথে নক্ষত্রটির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এটি আমাদের পর্যবেক্ষণের সাথে মিলে যায়। এ তত্ত্বটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। এক্ষেত্রে আমাদের চোখের সামনে শত শত ধূমকেতু থাকতে হবে এবং এরা হলো শুধু তারাই যারা আমাদের ও নক্ষত্রটির মাঝে এসে পড়বে। ফলে প্রকৃত সংখ্যা হবে অযুত অযুত ধূমকেতু। তবে সবগুলো ধারণার মধ্যে এটিই সেরা। ফলে আমরা এটি মেনে নিয়ে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করলাম।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। আমি যখন গবেষণাপত্রটি লিখছিলাম সেই সময়েই আমার দেখা হলো সহকর্মী জেসন রাইটের সাথে। সেও কেপলারের উপাত্ত নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখছিল। ওর বক্তব্য হলো- কেপলারের সূক্ষ্ম নজরের মাধ্যমে নক্ষত্রটির চারপাশে এলিয়েনদের স্থাপনা পাওয়া যাবে। কিন্তু পাওয়া গেলো না। আমি তাকে আমাদের অনুসন্ধানী দলের পাওয়া অদ্ভুত তথ্যগুলো দেখালে ও বললো, “উফ, ট্যাবি। আমাকে আবার নতুন করে লিখতে হবে।”

তবে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দুর্বল হয়ে পড়লে আমরা উৎসাহী হয়ে পড়লাম। আমরা পথ খুঁজতে লাগলাম কীভাবে এলিয়েন ব্যাখ্যা বাদ দেয়া যায়। ফলে আমরা এসইটিআই (Search for Extraterrestrial Intelligence) এর আমাদের একজন সহকর্মীকে এর দিকে মনোযোগ দিতে রাজি করালাম। গ্রিন ব্যাংক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে নক্ষত্রটিকে দেখার প্রস্তাব পেশ করলাম আমরা। কয়েক মাস পর এ কথা চলে গেলো প্রেসের কানে। শুধু এই একটি নক্ষত্র নিয়ে দশ হাজার খবর লেখা হয়ে গেল।

এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবেন, “ট্যাবি, তাহলে কি এর পেছনে সত্যিই এলিয়েন দায়ী?” আচ্ছা, এমন একটি সভ্যতার কথা কল্পনা করুন যারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। এক্ষেত্রে এরা নিজেদের গ্রহের সব শক্তি ব্যবহার করে শেষ করে ফেলবে। তাহলে এখন এরা শক্তি পাবে কোথায়? আমাদের সূর্যের মতো তাদের গ্রহও কিন্তু একটি নক্ষত্রকে ঘিরে পাক খাচ্ছে। এখন তারা যদি এ নক্ষত্র থেকে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে তবে শক্তির চাহিদা মিটে যায়। অতএব তারা বিশাল স্থাপনা তৈরি করবে। দৈত্যাকার সোলার প্যানেলের সাইজের এ বিশাল কাঠামোগুলোকে বলা হয় ডাইসন বলয় (Dyson Sphere)।

2চিত্রঃ ছবিতে শিল্পীদের উর্বর কল্পনায় ডাইসন বলয়ের নানান রকম চিত্র।

ব্যাপারটাকে এভাবে দেখা যায়। চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্বের ব্যবধান ১ মিলিয়নের (১০ লাখ) চার ভাগের এক ভাগ। আর সবচেয়ে সহজ হিসাব অনুসারে এ ডাইসন বলয়দের আকার এর ১০০ গুণ। এটি বেশ বড় বটে। এখন মনে করুন এমন কিছু একটি নক্ষত্রকে ঘিরে আছে। এমন জিনিসের পক্ষে উপাত্তের মধ্যে ব্যতিক্রম ও অস্বাভাবিক কিছু নিয়ে আসা খুবই সম্ভব।

কিন্তু আবার মাথায় রাখতে হবে যে, এলিয়েনদের এ বিশাল স্থাপনাকেও কিন্তু পদার্থবিদ্যার সূত্র মানতে হবে। যেকোনো কিছুই অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করতে চাইবে। তাকে ফলশ্রুতিতে অনেক বেশি তাপ সৃষ্টি মেনে নিতেই হবে। কিন্তু এমন কিছু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তবে আবার হতেই পারে যে বিকিরণ পৃথিবীর দিকে ঘটছে না।

আরেকটি ধারণাও আছে, আর এটি খুব প্রিয়ও বটে। আমরা হয়তো মহাকাশের একটি মহাযুদ্ধের সাক্ষী হয়েছি, যেখানে একটি গ্রহকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও অনেক ধূলিকণার সৃষ্টি হবার কথা। তবে আমরা যদি এলিয়েনদের অস্তিত্ব স্বীকার করেই নেই, তাহলে এটাই বা মেনে নিতে বাঁধা কোথায় যে তারা সব ধূলিকণা সাফ করে ফেলেছে। হুম, কল্পনার ঘোড়া বেশ দ্রুতবেগেই চলছে!

3চিত্রঃ নক্ষত্রের এলাকায় কোনো মহাযুদ্ধ চলছে নাতো?

আসলে আমরা এমন এক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, যাতে আমাদের অজানা কোনো প্রাকৃতিক ব্যাখ্যাও থাকতে পারে, আবার থাকতে পারে অজানা কোনো প্রক্রিয়ায় এলিয়েনের হাতও। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে অবশ্য আমি প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার পক্ষেই থাকব। কিন্তু আমাকে ভুল বুঝবেন না। এলিয়েন পেলে আমিও কারো চেয়ে কোনো অংশে কম খুশি হবো না। বাস্তবতা এ দুটোর যেটিই হোক, তা যে মজার হবে তাতে একদম সন্দেহ নেই।

এখন সামনে কী হবে? আমাদেরকে এর প্রতি কড়া নজর রাখতে হবে। তবে আমাদের মতো পেশাদার জ্যোতির্বিদদের হাতে হাতিয়ার কমই আছে। অন্যদিকে, কেপলার আছে অন্য একটি মিশনে।

তবে খুশির খবর হলো, স্বেচ্ছাসেবীদের দলগত অনুসন্ধান থেমে নেই। নিজস্ব ব্যাকইয়ার্ড টেলিস্কোপ দিয়ে শখের জ্যোতির্বিদরা একে পর্যবেক্ষণ করছেন। কী ঘটবে তা চিন্তা করে আমি খুব পুলকিত বোধ করছি। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, কম্পিউটার কখনোই এ নক্ষত্রটিকে খুঁজে পেতো না। এটি তো এমন কিছু খুঁজছিলই না। আমরা যদি এমন আরেকটি নক্ষত্র খুঁজে পাই তবে কেমন হবে? আর না পেলেই বা কেমন হবে?

[দর্শকের হাত তালির মাধ্যমে শেষ হয় টেড টকের আলোচনা।]

সামনে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে জ্যোতির্বিদ তাবেথা বয়াজিয়ান খুব উৎসুক ছিলেন। আলোচনাটি ছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। এতদিনে সত্যিই দারুণ আর কিছু ঘটনা ঘটেছে। আগস্টের ৩ তারিখে দুজন জ্যোতির্বিদ আরো কিছু প্রমাণ যোগ করে দেখিয়েছেন যে নক্ষত্রটি আসলেই বড় অদ্ভুত। নাসার কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ থেকে সংগৃহীত উপাত্ত নিয়ে বেনজামিন মনটেট ও জোশুয়া সাইমন তাদের গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা যাচ্ছে যে নক্ষত্রটি অস্বাভাবিক হারে উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে।

এ বছরের শুরুতে লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিদ ব্রেডলি শেফারও একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। এখানে তিনি অতীতের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখান যে গত এক শতাব্দী ধরেই নক্ষত্রটিতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী অনুজ্জ্বলতা প্রদর্শন করেছে। তার মতে এর অর্থ হলো- এলিয়েনরা বিশাল কোনো স্থাপনা গড়ে তুলছে।

তখন তার কথাকে হেসে উড়িয়ে দেয়া হলেও এখন সেটার পক্ষেই প্রমাণ শক্ত হলো। এখন দেখা যাচ্ছে যে ২০০৯ সালের পর থেকে নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতা ১,০০০ দিনের জন্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। এ হার শেফারের সময়ের হারের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে রহস্য ঘনীভূতই হচ্ছে। দেখা যাক, সামনে কী ঘটে?

নোট

নক্ষত্রটি কোথায় আছে? রাতের আকাশের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা বুঝতে পারবেন এর সম্পর্কে। এর অবস্থান হলো আকাশের সিগনাস বা বকমণ্ডলীতে। পুরো আকাশের সার্বিক অঞ্চলকে যে ৮৮ টি তারামণ্ডলীতে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো সিগনাস। বর্তমান সময়ে এ মণ্ডলীটি খুব সহজেই দেখা যায়। সন্ধ্যা নামলেই চলে আসে প্রায় মাথার উপরে। সেপ্টেম্বর মাসে রাত নয়টার দিকে তারামণ্ডলীটি মাথার উপর থাকে। অক্টোবর, নভেম্বর মাসের দিকে থাকে পশ্চিম আকাশে।

এর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ডেনেব বা পুচ্ছ কাছাকাছি অবস্থিত অপর দুটি নক্ষত্র- শ্রবণা ও অভিজিতের সাথে মিলে একটি ত্রিভুজ গঠন করেছে, যার নাম সামার ট্রায়াঙ্গেল। মণ্ডলীর চারটি প্রধান উজ্জ্বল তারাকে নর্দার্ন ক্রস বলেও ডাকা হয়।

মণ্ডলীর দুটো উজ্জ্বল তারা- ডেনেব ও ডেল্টা সিগনির প্রায় মাঝে আমাদের রহস্যময় তারাটি অবস্থিত। তবে একে খালি চোখে দেখা যাবে না। সর্বোচ্চ +৬ আপাত উজ্জ্বলতার নক্ষত্রকে খালি চোখে দেখা যায়। এর আপাত উজ্জ্বলতা হলো +১১.৭। উল্লেখ্য, আপাত উজ্জ্বলতার মান বেশি হলে বুঝতে হবে নক্ষত্রটি কম উজ্জ্বল। সূর্যের আপাত উজ্জ্বলতা হলো নেগেটিভ ২৭, চাঁদের নেগেটিভ ১২, শুক্র গ্রহের নেগেটিভ ৪ ইত্যাদি। তবে একটি ভালো মানের টেলিস্কোপ যোগাড় করতে পারলে নক্ষত্রটির পেছনে আপনিও নজরদারী চালাতে পারেন।

তথ্যসূত্র

১. earthsky.org/?s=tabby
২. earthsky.org/space/tabbys-star-more-weirdness
৩. ted.com/talks/tabetha_boyajian_the_most_mysterious_star_in_the_universe/ transcript?language=en#t-364057
৪. en.wikipedia.org/wiki/KIC_8462852

লেখকঃ

আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ
পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়