নতুন পৃথিবীর সন্ধানেঃ ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’

গ্রীক পুরাণে ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে অনেক রকমের কল্পকথা আছে। মানুষের এই কল্পনার জগতই পরবর্তীতে বিজ্ঞানের হাত ধরে অপা  র সম্ভাবনার নতুন এক দ্বার খুলে দিয়েছে। মহাশূন্যে কি আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে? আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় এই প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নাম, ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’।

কী এটি

‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’কে আমাদের প্রতিবেশিই বলা যায়। প্রক্সিমা সেন্টরি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা অনেকটাই পৃথিবীর মতো এ গ্রহটি সৌরজগত থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমাদের সবচেয়ে কাছের এ নক্ষত্র কিন্তু সূর্যের মতো এতটা উত্তপ্ত নয়। বামন আকৃতির শান্তশিষ্ট এই নক্ষত্রটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘রেড ডোয়ার্ফ স্টার’ বা লাল বামন নক্ষত্র।

গ্রহটি মোটামুটি পৃথিবী থেকে ২৫ ট্রিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থিত। এর ভর পৃথিবীর ভরের থেকে ৩০% বেশি। গ্রহটিতে গেলে মাত্র ১১ দিন পরপরই আপনার জন্মদিন পালন করতে পারবেন। কারণ পৃথিবীর মাত্র ১১ দিন সময়ে গ্রহটি তার নক্ষত্রের চারপাশে একবার ঘুরে আসে, পৃথিবীর ১১ দিনে সেখানে এক বছর হয়।

কোন বৈশিষ্ট্যর কারণে এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে

১৯৯২ সালে সৌরজগতের বাইরে প্রথম কোনো গ্রহ আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। মাঝে চলে গেছে প্রায় বিশটি বছর, এর মধ্যে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে তিন হাজারেরও বেশি ভিন গ্রহের দেখা মিলেছে। তবে কোনো নক্ষত্রের প্রাণ বান্ধব অঞ্চলে এবং একইসাথে পৃথিবীর এত কাছে থাকা কোনো গ্রহের সন্ধান মিলল এই প্রথম।

যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গ্রহটি ঘোরে তার ভর সূর্যের ভরের মাত্র ১২%। ভর কম হওয়াতে এর হ্যাবিটেবল জোন নক্ষত্রের অনেক কাছ থেকেই শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের যত কাছে অবস্থিত তার চেয়ে ২৫ গুণ কাছে অবস্থিত গ্রহটি। গ্রহটিতে যদি বায়ুমণ্ডল থাকে তাহলে এর তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে হবে যেটি ঐ গ্রহে পানির থাকার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করে। কারণ এই তাপমাত্রায় পানি বাষ্পীভূত হবে না। আর পানি থাকলে প্রাণের অস্তিত্ব মিলবে- এমন আশা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

2

প্রাণ সৃষ্টিতে কিছু অন্তরায় থাকতে পারে

কোনো গ্রহে প্রাণ সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডল থাকাটা খুব জরুরি। প্রক্সিমা সেন্টরি-বি গ্রহে বায়ুমণ্ডল আছে কিনা বা তা কোনো কালে ছিল কিনা, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

প্রক্সিমা-বি এর নক্ষত্রের অনেক কাছ দিয়ে একে প্রদক্ষিণ করে। নক্ষত্রের চারপাশ দিয়ে ঘোরার সময় নক্ষত্রটির আকর্ষণে ‘টাইডালি লক’ হয়ে শুধুমাত্র এর একটি পৃষ্ঠই নক্ষত্রের দিকে থাকে, যেমনটি চাঁদ পৃথিবীর দিকে এর একপাশ দিয়েই ঘুরতে থাকে। অন্য দিকটিতে নক্ষত্রের আলো বা তাপ সেক্ষেত্রে পৌঁছাতেই পারে না। এমনকি এখানে কোনো দিন-রাত বা আহ্নিক গতি বলে কিছু নেই। যে অক্ষে এটি তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরে তা পুরোপুরি গোলাকার হওয়ায় এখানে কোনো ঋতুও নেই।

ঐ ভিন গ্রহের যে দিকটা তার নক্ষত্রের সামনে রয়েছে, তার ওপর অনবরত এসে আছড়ে পড়ে সৌরঝড়, মহাজাগতিক রশ্মি, নানা রকমের বিকিরণ, যা প্রাণ সৃষ্টিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। এত প্রতিকূলতার পরেও যদি অতীতে কখনো সেখানে প্রাণের সৃষ্টি হয়েও থাকে বা ভবিষ্যতে সম্ভাবনা থেকে থাকে তাহলে এ সৌরঝড় বা বিকিরণের দরুণ প্রাণের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

পৃথিবীর দুই মেরুকেও কিন্তু এরকম সৌরঝড় বা মহাজাগতিক রশ্মির মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র খুব শক্তিশালী হওয়ায় তা এই বিপজ্জনক কণাগুলিকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে আসতে না দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এ ধরনের প্রতিরক্ষা আদৌ আছে কিনা সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহে, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

পৌঁছানো কি সম্ভব3

চার আলোকবর্ষ অনেক দীর্ঘ পথ, ২৫ ট্রিলিয়ন মাইলেরও বেশি। বর্তমানে যে প্রযুক্তির রকেট রয়েছে তাতে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ৮০ হাজার বছর লেগে যাবে। ভবিষ্যতের কোনো অগ্রগতির সময়ে পৃথিবী থেকে মহাকাশচারীদের পদচারণা ঘটতে পারে গ্রহটিতে। কিন্তু তাহলে কি এত বড় আবিষ্কারের পরও বিজ্ঞানীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন ৮০ হাজার বছর? না, সম্প্রতি নাসা নতুন একটি মহাকাশযান তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন যার মাধ্যমে মাত্র ২০ বছরেই প্রাণের সন্ধানে পৌঁছে যাওয়া যাবে এ গ্রহে।

২০১৫ সালে নাসার নিউ হরাইজনস প্রোব ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫২,০০০ মাইল গতিতে ৯.৫ বছরে ৩ বিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্লুটো ভ্রমণ সম্পন্ন করে। নিউ হরাইজনস প্রোবকে প্রক্সিমা-বি তে পাঠিয়ে দিলে এর কক্ষপথে প্রবেশ করতে মহাকাশযানটির লাগবে ৫৪,৪০০ বছর। জুপিটারের কক্ষপথে নাসার জুনো প্রোব ঘণ্টায় ১,৬৫,০০০ মাইল গতি নিয়ে প্রবেশ করে, যা প্রক্সিমা-বি পর্যন্ত যাত্রা করতে সময় নেবে ১৭,১৫৭ বছর। এ সংখ্যাটিও কিন্তু বিশাল।

আশার বাণী হলো ব্রেকথ্রু স্টারশট ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতাগণ উচ্চগতির অতি পাতলা এক ধরনের প্রোব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লেজারের মাধ্যমে একে আলোর ২০% গতিতে ত্বরান্বিত করা সম্ভব (ঘণ্টায় ১৩৪.১২ মিলিয়ন মাইল)। এই গতিতে চললে প্রোবটি ২০-২৫ বছরেই পৌঁছে যাবে প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে। সেখান থেকে পৃথিবীতে সিগনাল আসতে সময় লাগবে ৪.৩ বছর।

এ প্রজেক্টটির পেছনে খরচ হবে ১০ বিলিয়ন ডলার আর মহাকাশযানটি তৈরিতে লেগে যাবে ২০-৩০ বছরের মতো। অর্থাৎ সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির প্রোবটিও প্রস্তুত হতে ও গ্রহটিতে পৌঁছতে মোট সময় লাগবে ৫৫ বছরের মতো অর্থাৎ প্রায় ২০৭০ সাল।

প্রক্সিমা-বি তে যদি পৌঁছে যান তাহলে ২৪ ঘন্টা অতিবেগুনী রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন মেখে ঘোরার সাথে সাথে যাবতীয় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার থেকেও আপনাকে বিরত থাকতে হবে। লাল বামন থেকে উদ্ভুত অগ্নিশিখা এবং অন্যান্য বিপজ্জনক রশ্মি এর পৃষ্ঠে ইলেকট্রনিক এমনকি জৈবকোষও ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে প্রথম পদক্ষেপের জন্য এর অন্ধকার অংশটাই তুলনামূলক নিরাপদ।

আপাতত অবস্থা যেমনই হোক, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা ভালো কিছুর আশা নিয়েই তাদের গবেষণার পথ পাড়ি দেবেন। বর্তমানে গবেষকগণ এ গ্রহের আবহাওয়াকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দশ বছরের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাওয়া ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ অথবা আরো পরবর্তীতে চিলি ও হাওয়াইয়ে ভূপৃষ্ঠের উপর নির্মার্ণাধীন (২০-৪০ মিটার ব্যাসের দর্পণ বিশিষ্ট) টেলিস্কোপ গবেষকদের আশার আলো দেখাচ্ছে।

আমরা শুধু অপেক্ষাই করতে পারি। হতে পারে প্রক্সিমা সেন্টরি-বিই হতে যাচ্ছে শত-সহস্র বছর পরের প্রাণের আধার। যখন এ নতুন গ্রহ আবিষ্কারের খবর পেলাম, রাতের আকাশে তাকিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরিকে নিয়ে ভাবছিলাম। কী আছে ওখানে? কে আছে ওখানে? কল্পনা করতে ভালো লাগছিল যে হয়তো মিটমিট করে জ্বলতে থাকা ঐ তারকারাজীর মধ্যেই কোনো একটি গ্রহে বসে কেউ একজন আমাদের সূর্যের দিকে তাকিয়েও ঠিক এভাবেই শিহরিত হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

www.space.com/­33932-proxima-b-alien-life-down-the-block.html

www.eso.org/public/­news/eso1629/

www.nature.com/news/earth-sized-planet-around-nearby-star-is-astronomy-dream-come­true-1.20445

 

লেখকঃ

ফাহমিদা ফারজানা অনন্যা
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়