মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

 

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

 2      চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।3

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

4চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

5

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

6

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

7

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

8চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র: The priest physician of Egypt

লেখকঃ হাসনাত বিন জুবায়ের

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ